রবিবার, ৩০ জানুয়ারি, ২০১১

কোন পথে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স

জাতীয় পতাকার বাহক বাংলাদেশ বিমান, পুরো নাম বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স। বিমানের একসময় স্লোগান ছিল আকাশের শান্তির নীড়। সত্যি বিদেশগামী বা প্রবাস থেকে স্বদেশ ফেরত নাগরিকরা নিজের নীড়ই বিবেচনা করতেন বিমানকে। নানা কারণেই বিমান তার সেই ভাবমূর্তি রক্ষা করতে পারেনি। ফলে ব্যবসায়ও ধস নেমেছে। বর্তমানে বিমানে চলছে ঠা-া লড়াই। বিমান কর্তৃপক্ষ, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় আর সংসদীয় কমিটি এই তিন সত্তার মধ্যে ধারণাগত কোনো মিল নেই। জাতীয় সংস্থা বিমানের এসব দিক নিয়েই এ প্রতিবেদন।

বিমান কতটা পাবলিক লিমিটেড কোম্পানি
স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে বাংলাদেশ বিমান একটি স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান (করপোরেশন) হিসাবে যাত্রা শুরু করে। প্রতিষ্ঠার শুরু থেকেই বাংলাদেশের যাত্রীদের কাছে বেশ জনপ্রিয় হয়ে ওঠে বাংলাদেশ বিমান। কিন্তু পরবর্তী সময়ে বেসরকারি বিমান সংস্থাগুলো যাত্রা শুরু করলে অব্যবস্থাপনা আর দুর্নীতির কারণে ধীরে ধীরে জনপ্রিয়তা হারায় প্রতিষ্ঠানটি। অপরদিকে প্রসার লাভ করে বেসরকারি খাত। অব্যাহত লোকসান থেকে বাঁচাতে বিমান বাংলাদেশকে লিমিটেড কেম্পানি করা হয়। ২০০৭ সালের ৭ ডিসেম্বর রাষ্ট্রপতি স্বাক্ষরিত এক গেজেটের মাধ্যমে ৩৬ বছরের পুরনো এ প্রতিষ্ঠানকে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স লিমিটেড নামে পাবলিক কোম্পানি করা হয়।
প্রথম এক বছরে সিদ্ধান্তহীনতায় কোনো কাজই করতে পারেনি বিমান। এরপর একটু ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করলেই একশ্রেণীর দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা, কর্মচারী, পাইলট, ফাস্ট অফিসারসহ কেবিন ক্রুদের অসহযোগিতার কারণে সেটা বারবার হোঁচট খাচ্ছে। বিমানের চেয়ারম্যান এয়ার মার্শাল (অব.) জামাল উদ্দিন বলেছেন, দুর্নীতিবাজরাই বিমানে সবচেয়ে বেশি শক্তিশালী। তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থাই নেয়া যাচ্ছে না। এদের বিরুদ্ধে কোনো উদ্যোগ নিলেই তারা ঐক্যবদ্ধ হয়ে আন্দোলনে নামছে। তবে বিমান সত্যি সত্যি কি পাবলিক লিমিটেড কোম্পানি হয়েছে এ নিয়েও দেখা দিয়েছে বিতর্ক। বিমান পরিচালনার জন্য একটি বোর্ড থাকলেও বিভিন্ন বিষয়ে সরকাররের হস্তক্ষেপের ফলেই এই প্রশ্ন দেখা দিয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানান।


লোগো নিয়ে খেল তামাসা
গত ৩ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিমানের পরিবর্তিত লোগো উদ্বোধন করেন। এর এক সপ্তাহ পর লোগো পরিবর্তন উপলে বিমানের প থেকে একটি প্রীতিভোজের আয়োজন করা হয়। সেই অনুষ্ঠানে প্রায় পাঁচ হাজার অতিথিকে আপ্যায়ন করে বিমান।
এর আগে বিমানের চেয়ারম্যান অবসরপ্রাপ্ত এয়ার মার্শাল জামাল উদ্দিন আহমেদ বিমানের পুরনো লোগোটি পরিবর্তনের উদ্যোগ নেন। তিনি বিমানের জন্য বিকল্প লোগো ও রঙেরও বেশ কয়েকটি নমুনা প্রধানমন্ত্রীর সামনে তুলে ধরেন। একাধিক বিকল্প থেকে প্রধানমন্ত্রী একটি লোগো পছন্দ করেন বলে জানান বিমান কর্তৃপক্ষ। লোগোতে বলাকার স্থির পাখার পরিবর্তে উড়ন্ত পাখা আঁকা হয়েছে। লোগোটি উদ্বোধনের পরপরই এর রং নিয়ে বিতর্কের সৃষ্টি হয়। বলা হয় এটি বাংলাদেশি কোনো বক নয় বরং এটি ক্রেইন সারসের সঙ্গে বেশি সামঞ্জস্যপূর্ণ। এরপর একটি অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কয়েকজন শিল্পী-সাহিত্যিকের দেখা হলে তারা প্রধানমন্ত্রীকে জানান যে পটুয়া কামরুল হাসান বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে আগের লোগোটি এঁকেছিলেন। রংসহ বকের বিষয়ে বিতর্কের বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীকে অবহিত করলে তিনি তাদের পুরনো লোগোতে ফিরে যাওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন। এরই ধারাবাহিকতায় ২২ মার্চ মন্ত্রিসভা বৈঠকে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা শুরু করেন প্রধানমন্ত্রী নিজেই। আলোচনা শেষে লোগো পরিবর্তন করে পুরনো লোগোতে ফিরে যাওয়ার জন্য বিমানকে নির্দেশনা দেওয়ার দায়িত্ব দেওয়া হয় বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়কে। একটি নতুন লোগো নির্ধারণ এবং ২ মাসের মধ্যে আবার পুরনো লোগোতে ফিরে যাওয়ায় বিমানের কোটি কোটি টাকা ক্ষতির পাশাপাশি বহির্বিশ্বে প্রতিষ্ঠানটির সুনাম ুণœ হয়েছে বলে মনে করেন এভিয়েশন অভিজ্ঞরা। বিমানের কয়েকজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বললে তারা ২০০০-কে বলেন, পাবলিক লিমিটেড কোম্পানি হওয়ার পর তার রিব্র্যান্ডিং হতেই পারে। স্বাধীনতার পর রাষ্ট্রপতি হিসাবে তো সবকিছু বঙ্গবন্ধুর নির্দেশেই হয়েছে। লোগো পরিবর্তন যদি ভুল কিছু হয়ে থাকে তাহলে তো কোনো কিছুই পরিবর্তন করা যাবে না। বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে তখন লোগোটি তৈরি করা হয়েছিল আর এখন বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে সেই লোগো বহাল থাকল। তাহলে তখনকার করপোরেশন আর এখনকার কোম্পানির মধ্যে পার্থক্য কী থাকল।



ছোট হয়ে আসছে বিমানের আকাশ
একসময় বিমান বাংলাদেশের আকাশপথ (রুট) ছিল ২৬টি। বর্তমানে ১৮টি। দুর্নীতি আর অব্যবস্থাপনার জন্যই এ দুর্গতি বলে মনে করেন সংশ্লিষ্ট অনেকে। বর্তমানে মোট যাত্রীর তুলনায় বিমান বাংলাদেশ যাত্রী বহন করছে ২০ শতাংশ। অথচ কয়েকদির আগেও এ হার ছিল ৪০ শতাংশ। বাকি ৮০ শতাংশ যাত্রী বহন করছে বিদেশি এয়ারলাইন্স ও দেশি বেসরকারি এয়ারলাইন্সগুলো। বিমান আগে প্রতিবছর ৩০ লাখ যাত্রী পরিবহন করলেও এখন পরিবহন করছে ১৫ লাখেরও কম। বিদেশি এয়ারলাইন্সগুলো গত এক বছরে বাংলাদেশ থেকে ৮০ লাখের বেশি যাত্রী পরিবহন করে আয় করেছে দেড় হাজার কোটি টাকার বেশি। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, বিমানের ভেতরে বাইরে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে। ওই সিন্ডিকেটই বিমানের তৈরি আকাশপথগুলো বেসরকারি দেশি-বিদেশি কোম্পানির হাতে তুলে দেওয়ার জন্য কাজ করছে।
জানা গেছে, যাত্রী পরিবহন করে দেশি-বিদেশি এয়ারলাইন্সগুলো প্রতিমাসে কোটি কোটি টাকা আয় করলেও বছরের পর বছর বাংলাদেশ বিমান লোকসান গুনছে। সম্প্রতি বিমানকে কোম্পানি করার পর যৎসামান্য লাভের মুখ দেখলেও বিদেশি এয়ারলাইন্সের তুলনায় সেটি খুবই নগণ্য। বিশেষজ্ঞদের মতে, বোয়িংয়ের কাছ থেকে উড়োজাহাজ আসার আগেই বিমানের বাজার দখল হয়ে যাবে। ইতিমধ্যে দুবাই, মালয়েশিয়া ও লন্ডনের মতো জায়গায় বিমানের যাত্রী কমে গেছে। এ ৩টি রুট এখন বেসরকারি এয়ারলাইন্সের দখলে। একইভাবে ঢাকা-নিউইয়র্ক, ঢাকা-টোকিও, ঢাকা-ম্যানচেস্টার, ঢাকা-প্যারিস রুটে বিমানের ফাইট না থাকায় বিদেশি এয়ারলাইন্সগুলো এসব রুটে দেদার ব্যবসা করছে। বিশ্বের ৪০টি দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের দ্বিপাকি এয়ার সার্ভিসেস চুক্তি রয়েছে। এর মধ্যে ২০টি দেশের ২৬টি গন্তব্যে বিমান ফাইট পরিচালনা করত। বর্তমানে ১৮টি রুটে ফাইট পরিচালনা করছে। ২০০৭ সালে বিমান নিউইয়র্ক, জাপানের নারিতা, ফ্রাঙ্কফুর্ট, ম্যানচেস্টার, প্যারিস, ব্রাসেলস, ইয়াংগুন, মুম্বাইসহ ৯টি রুটে ফাইট পরিচালনা বন্ধ করে দেয়। এছাড়া ব্যাংকক, সিঙ্গাপুর, হংকং, কুয়েত, কুয়ালালামপুর, জেদ্দা ও আবুধাবির মতো রুটে ফাইট অপারেশন আগের চেয়ে কমিয়ে দেয়। বন্ধ করা ও কমিয়ে দেওয়া রুটগুলোতে বিদেশি ও প্রাইভেট এয়ারলাইন্সকে ফাইট পরিচালনার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। বিমানের এক কর্মকর্তা বলেন, ১-২ ঘণ্টার নোটিশে রুট বন্ধ করে দেওয়া হয়। কিন্তু একটি রুট তৈরির পেছনে কত বছরের নিরলস শ্রম ও চেষ্টা, সেটা কেউ খতিয়ে দেখে না। বিমানের তৈরি করা বাজারে একের পর এক প্রাইভেট এয়ারলাইন্সকে ফাইট পরিচালনার অনুমতি দেওয়া নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। এমিরেটস, কাতার, জেট এয়ার, কিংফিশার, গালফ এয়ার, কুয়েত এয়ারওয়েজ, থাই এয়ার, মালয়েশিয়ান এয়ারলাইন্সসহ সব বিদেশি এয়ারলাইন্স এখন লাভের মুখে আছে। বিদেশি এয়ারলাইন্স গত এক বছরে বাংলাদেশ থেকে ৮০ লাখের বেশি যাত্রী পরিবহন করে আয় করেছে দেড় হাজার কোটি টাকার বেশি। সেখানে রাষ্ট্রীয় পতাকাবাহী বিমান পরিবহন করেছে মাত্র ১৫ লাখ যাত্রী। সিডিউল ঠিক রাখতে না পারা, যাত্রীসেবার মান উন্নয়ন না করা, ঘন ঘন যান্ত্রিক ত্রুটি, দুর্নীতি, অপচয়, মাথাভারী প্রশাসনÑ এসব কারণে বিমান প্রতিযোগিতায় টিকতে পারছে না বলে অ্যাভিয়েশন সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
ঢাকা-নিউইয়র্ক রুটে বিমান চালানো বন্ধ প্রসঙ্গে বিমানের এক কর্মকর্তা বলেন, ঢাকা থেকে সরাসরি নিউইয়র্কে যাতায়াত করতে সক্ষম কোনো উড়োজাহাজ বর্তমানে বাংলাদেশ বিমানের নেই। ঢাকা-নিউইয়র্ক রুটে বিমান চালাতে হলে দুবাই, লন্ডনসহ চার-পাঁচটি বিমানবন্দরে যাত্রাবিরতি দিতে হবে। এতে করে বিমান আরো বেশি লোকসানে পড়বে।
বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের বহরে ৬টি ডিসি-১০, ৪টি এয়ারবাস, ৪টি এফ-২৮ উড়োজাহাজ ছিল। কিন্তু বারবার দুর্ঘটনা ও অযতœ-অবহেলায় বর্তমানে বিমানের বহরে উড়োজাহাজের সংখ্যা ১২টি। এর মধ্যে ভাড়ায় চালানো হচ্ছে ২টি উড়োজাহাজ। বিমান সূত্রে জানা যায়, ২০১৭ সালে এ বহরে যোগ হবে আরো ১০টি এয়ারক্রাফ্ট। কিন্তু যখন যাত্রী স্বল্পতার কথা বলে বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে একের পর এক রুট তখন এতগুলো উড়োজাহাজ এনে কী লাভÑ এমন প্রশ্ন দেখা দিয়েছে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে।


৮০ কোটি টাকা লোকসান
অব্যাহত লাভের প্রচারণা করা হলেও সম্প্রতি ২০০৯-২০১০ অর্থবছরের হিসাব প্রকাশ করেছে বিমান। এই হিসাবে আয় দেখানো হয়েছে ২৯৪৩,৬২৪০৯১০ টাকা এবং ব্যয় দেখানো হয়েছে ৩০২৩,৭৬০৩৮২৪ টাকা। অর্থাৎ লোকসানের পরিমাণ ৮০ কোটি ১৩ লাখ ৬২ হাজার ৯শ ১৪ টাকা। বিমানমন্ত্রী সংসদে এ হিসাব তুলে ধরলে ভেতরে-বাইরে আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়। পরে সরকারের পক্ষ থেকে মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা তরফদার মোঃ আক্তার জামিল স্বাক্ষরিত বিমানকে লেখা একটি চিঠিতে এ হিসাব প্রত্যাখ্যান করে এর কারণ অনুসন্ধানের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।


নানা পক্ষের বিরোধে স্থবির বিমান
বিমান মন্ত্রণালয় ও অধীনস্থ সংস্থাগুলোতে শৃঙ্খলা ভেঙে পড়েছে। কেউ কাউকে মানছে না। ইচ্ছামতো সিদ্ধান্ত নিচ্ছে সংশ্লিষ্ট সংস্থার কর্তাব্যক্তিরা। বিমানমন্ত্রী বলছেন এক, বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ কাজ করছে অন্য। আবার মন্ত্রণালয়ের সচিব বলেন এক কথা, মন্ত্রী বলেন অন্যটি। বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটন মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি যা চায়, বিমান মন্ত্রণালয় তা নাকচ করে দেয়। এভাবে মূলত স্থবির হয়ে গেছে বিমানের অগ্রযাত্রা। পরিস্থিতি সামাল দিতে সব পক্ষের মধ্যে সমন্বয় করার জন্য প্রধানমন্ত্রী একজন উপদেষ্টা নিয়োগ দিয়েছেন। কিন্তু তারপরও পরিস্থিতির কোনো উন্নতি লক্ষ করা যাচ্ছে না। এর মধ্যেই কয়েকবার বিমানমন্ত্রী জিএম কাদেরকে সরিয়ে দেওয়া এবং মন্ত্রীর সেচ্ছায় পদত্যাগের গুজব উঠেছিল। তবে জিএম কাদেরের ঘনিষ্ঠরা জানিয়েছেন, সরকার এ ধরনের সিদ্ধান্ত নিলে তিনি পদত্যাগ করতে পারেন। এ ব্যাপারে মন্ত্রীর বক্তব্য হচ্ছে, তাকে সরানোর জন্য যৌক্তিক কারণ দেখাতে হবে। তিনি দেশ এবং বিমানের স্বার্থে কাজ করছেন। তাকে সরানোর মানে হলো, যারা দেশের স্বার্থ জলাঞ্জলি দিয়ে নিজের স্বার্থে কাজ করছে, তাদের পৃষ্ঠপোষকতা দেওয়া। অন্যদিকে অন্য আরেক পক্ষ পাইলটদের সংগঠন বাংলাদেশ পাইলট অ্যাসোসিয়েশনের সাম্প্রতিক ধর্মঘট এবং পরবর্তী সময়ে বিমান কর্তৃপক্ষের তদন্ত করা নিয়ে যে জটিলতা সৃষ্টি হয়েছে তা এখনো কোনো সফল সমাধানের দিকে যেতে পারেনি। সঙ্কটের আপাত নিরসন হয়েছে মাত্র।


মন্ত্রী ও বিমান কর্তৃপক্ষের মধ্যে দ্বন্দ্ব
ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই) আয়োজিত ‘বেসামরিক পরিবহন ব্যবস্থা ও পর্যটন শিল্পের সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ’ শীর্ষক এক সেমিনারে বিমানমন্ত্রী জিএম কাদের বিমান কর্তৃপরে কড়া সমালোচনা করে বক্তব্য দেওয়ায় বিমানের এমডি চিঠি পাঠান মন্ত্রী জিএম কাদেরকে। গত ১৮ জুলাই ওই সেমিনারে মন্ত্রী বলেছিলেন, দুর্নীতিবাজদের শক্ত একটি চক্র বিমান ও সিভিল এভিয়েশনসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ খাতে গুরুতর অনিয়ম করছে। বিমান কোম্পানি হওয়ার পরও সুফল মিলছে না। পরিচালকদের বিনিয়োগ থাকলে তারা মুনাফার কথা চিন্তা করে সিদ্ধান্ত নিতেন।
মন্ত্রীর এ বক্তব্যে ুব্ধ হয়ে বিমান পরিচালনা পরিষদের চেয়ারম্যান জামালউদ্দিন, ব্যবস্থাপনা পরিচালক জাকীউল ইসলামসহ পরিষদের অন্য সদস্যরা ২৪ জুলাই বৈঠকে বসেন। সেখানে পরিচালনা পরিষদের সমালোচনা করায় মন্ত্রীর কাছে চিঠি পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। দায়িত্ব দেওয়া হয় বিমানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও সিইও মুহম্মদ জাকীউল ইসলামকে। পরদিনই এমডি চিঠি পাঠান জিএম কাদেরকে। চিঠিতে মন্ত্রী বিমান নিয়ে এ ধরনের বক্তব্য দিতে পারেন কি না সে বিষয়ে প্রশ্ন তোলেন। চিঠিতে তিনি বিমানের পরিচালক ও পরিচালনা পরিষদের পারফরমেন্স সম্পর্কে মন্ত্রীকে আন্তরিকতাপূর্ণ বক্তব্য রাখার পরামর্শ দেন।
বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র জানায়, নীতিমালা লঙ্ঘন করে ২৬ বছরের পুরনো নাইজেরিয়ান লক্কড়-ঝক্কড় বিমানে হাজী পরিবহন করা, বিমানবন্দর-লাগোয়া ৪৩৪ বিঘা জমি বিদেশিদের হাতে তুলে দেওয়া, নিজেদের উড়োজাহাজ বসিয়ে রেখে ভাড়ার উড়োজাহাজ দিয়ে যাত্রী পরিবহন এবং ফ্রি টিকিট সুবিধা নিয়ে মূলত এ বিরোধ। সূত্র জানায়, এখন স্পটত দুটি প হয়ে গেছে। একদিকে আছে বিমান মন্ত্রণালয় আর অন্যদিকে বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটন মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি এবং বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপ।
মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট একটি সূত্রে জানা গেছে, এ চিঠি পাওয়ার পর মন্ত্রী অবাক হয়ে যান এবং ক্ষুব্ধ হন। তিনি তাৎক্ষণিকভাবে বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীকে জানান।
ঘটনা এখানেই শেষ নয়। ঠিক এক মাস পরে ১৮ আগস্ট সংবাদ সম্মেলনে হাজির হন বিমানের চেয়ারম্যান এয়ার মার্শাল (অব.) জামাল উদ্দিন।। এবার নিজেই তিনি মন্ত্রীর বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ উত্থাপন করেন। তিনি বলেন, বেসামরিক পরিবহন সংস্থার মন্ত্রীর বিমানের ব্যাপারে হস্তপে করার কোনো এখতিয়ার নেই। শুধু মন্ত্রীই নন, তিনি বিমান মন্ত্রণালয়ের সচিবেরও সমালোচনা করেন। বিমানের চেয়ারম্যানের এ ধরনের ধৃষ্টতা দেখে মন্ত্রী জিএম কাদের, ভারপ্রাপ্ত সচিব শফিক আলম মেহেদীসহ মন্ত্রণালয়ের অন্য কর্মকর্তারা ুব্ধ হন। এর ফলে শৃঙ্খলা বিধিমালা ভঙ্গের অভিযোগে বাংলাদেশ বিমান এয়ারলাইন্স বোর্ডের চেয়ারম্যান এয়ার মার্শাল (অব.) জামাল উদ্দিনকে শোকজ করা হয়।
বিমান মন্ত্রণালয়ের পে যুগ্ম সচিব (বিমান ও সিএ) আফতাব উদ্দিন তালুকদার স্বারিত শোকজে বলা হয়েছে, ‘১৮ আগস্ট সংবাদ সম্মেলন করে এবং এর আগে বিভিন্ন সময় আপনি মন্ত্রণালয় সম্পর্কে নানা মন্তব্য করেছেন, যা ইলেক্ট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়ায় প্রচার হয়েছে। এতে জনমনে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, যা শৃঙ্খলা পরিপন্থি।’ এ ব্যাপারে বিমানের চেয়ারম্যানের ব্যাখ্যা তলব করা হয়েছে।


সচিবের বক্তব্য নিয়ে বিতর্ক
গত ২২ এপ্রিল ময়মনসিংহে বিমান সচিব শফিক আলম মেহেদী সংবাদ মাধ্যমকে বলেন, ‘এরই মধ্যে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরটিকে আন্তর্জাতিকভাবে পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়েছে। ওই বিমানবন্দরটি আর বেশিদিন আন্তর্জাতিক রুট হিসাবে ব্যবহার করা যাবে না।’ সরকারি কোনো সিদ্ধান্ত ছাড়াই সচিবের এমন বক্তব্যে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়ে বিমান মন্ত্রণালয়। মন্ত্রী সিভিল এভিয়েশন কর্মকর্তাদের কাছে এ ঘোষণা সম্পর্কে জানতে চান। সিভিল এভিয়েশন কর্মকর্তারা এ সংক্রান্ত কোনো তথ্য তাদের জানা নেই বলে মন্ত্রীকে জানান। ২৬ এপ্রিল সচিবকে লেখা চিঠিতে বিমানমন্ত্রী জিএম কাদের বলেন, ‘সরকারের সচিবের বক্তব্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের েেত্র সরকারি বক্তব্য হিসেবে বিবেচিত হয়। গত ২৩ এপ্রিল দৈনিক মানবজমিন ও আমাদের সময়ে আপনার বরাত দিয়ে প্রকাশিত সংবাদে বলা হয়েছে, বর্তমান বিমানবন্দরটিকে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর হিসাবে আন্তর্জাতিকভাবে পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়েছে এবং এ বিমানবন্দরটি আর বেশি দিন আন্তর্জাতিক রুট হিসাবে ব্যবহার করা যাবে না। আমার জানা মতে, বিষয়টি সত্য নয়। সরকারি ভাষ্য হিসাবে বিবেচিত হবে বিধায় ভবিষ্যতে এ ধরনের নেতিবাচক সংবাদ বিভিন্ন দিক থেকে তিকারক হবে ও স্বার্থান্বেষী মহল এতে ফায়দা নিতে পারে। অনতিবিলম্বে এ বিষয়ে সঠিক বক্তব্য সংবাদপত্রে প্রেরণ করা জরুরি। দয়া করে ব্যবস্থা নিন।’
এরপর সচিবের কয়েকটি সাাৎকার নিয়েও মন্ত্রী বিব্রত হন। এ ঘটনার পরিপ্রেেিত মন্ত্রী সচিবকে কড়া ভাষায় আরেকটি চিঠি লেখেন। চিঠিটি ছিল এ ধরনের ‘সচিব, এসব বিষয়ে দয়া করে হঠাৎ সংবাদমাধ্যমে না যাওয়ার অনুরোধ করছি। পরে আমার সঙ্গে আলাপ না করে সংবাদ প্রকাশ করবেন না।’
বিমানের একজন শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে ২০০০-কে বলেন, মন্ত্রণালয় বিমানকে করপোরেশনের মতোই চালাতে চাচ্ছে। অপরদিকে বিমান কর্তপক্ষ চাচ্ছে কোম্পানির বৈশিষ্ট্য অনিুযায়ী বিমানকে চালাতে। এখান থেকেই দ্বন্দ্বের শুরু বলে তিনি জানান।


পাইলটরা নেমেছিলেন রাজপথে
বিমান কর্তৃপক্ষের সঙ্গে নানা কারণে দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়ে আকাশে বিমান না চালিয়ে রাজপথে নেমেছিল বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের পাইলটরা। গত ২০ অক্টোবর সংবাদ সম্মেলন করে ৫ দফা দাবিতে ধর্মঘট শুরু করেন পাইলটরা। তারা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স লিমিটেডকে ২৪ ঘণ্টার আল্টিমেটাম দেন। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে দাবি পূরণ না হওয়ায় ২২ অক্টোবর থেকে পাইলটরা কর্মবিরতি শুরু করেন। সংবাদ সম্মেলন করায় ২৪ অক্টোবর পাইলট অ্যাসোসিয়েশনের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকসহ চার পাইলটকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেয় বিমান কর্তৃপ। এরপর ২৬ অক্টোবর রাতে চার পাইলটকে ফাইট পরিচালনা থেকে সাময়িক অব্যাহতি দেওয়া হয়। এসব ব্যবস্থার প্রতিবাদে রাতেই অনির্দিষ্টকাল কর্মবিরতির সিদ্ধান্ত নেয় ১১৬ পাইলটের সংগঠন বাপা। ২৭ অক্টোবর সন্ধ্যার মধ্যে ৫৩ পাইলট অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে ফাইট চালাতে অস্বীকৃতি জানান। এ অবস্থায় বিমানের ফাইট সূচি বিপর্যয়ের মধ্যে পড়ে। সবচেয়ে বেশি বিপর্যয় ঘটে ২৮ অক্টোবর। পাইলট সঙ্কটের কারণে ওই দিন অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক গন্তব্যের ১৫টি নির্ধারিত ফাইটের মধ্যে ৮টি বাতিল করতে বাধ্য হয় বিমান কর্তৃপ।
পাইলটদের চাকরির বয়সসীমা ৫৭ থেকে বাড়িয়ে ৬২ বছর করে সম্প্রতি এক আদেশ জারি করেছিল বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স। এ আদেশকে অবৈধ আখ্যায়িত করে তা বাতিলের দাবি জানায় বাপা। তাদের অন্য দাবির মধ্যে রয়েছে ওয়েট লিজ (ক্রু, ইন্স্যুরেন্সসহ ভাড়া করা বিমান) বাতিল করে ড্রাই লিজ (শুধু বিমান ভাড়া করা) করা, বিমানের সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ব্যক্তিগত পাওনা সমন্বয়ের নামে ইনক্রিমেন্ট বন্ধ করার উদ্যোগ বন্ধ, বিমানের চাকরিচ্যুত দুই কর্মকর্তাকে অবিলম্বে চাকরিতে বহাল করে সুনির্দিষ্ট অভিযোগে তাদের বিচারের ব্যবস্থা এবং বিমান গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং মানসম্পন্ন করতে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি কেনা ও জনবল বাড়ানো। এ দাবি সম্পর্কে কর্তৃপরে বক্তব্য হচ্ছে, বয়স বাড়ানোর বিষয়টি আদালতে বিচারাধীন থাকায় এ নিয়ে তারা কিছু বলতে পারবেন না। অন্য দাবি সম্পর্কে তাদের বক্তব্য হচ্ছে, ফাইট লিজের বিষয়ে পাইলটদের বক্তব্য অনধিকার চর্চা।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে ২৯ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাপার নেতৃবৃন্দকে দাবি পূরণের আশ্বাস দিয়ে ধর্মঘট প্রত্যাহারের অনুরোধ করলে রাতেই বাপা ধর্মঘট প্রত্যাহারের ঘোষণা দেয়। পরদিন বাপা নেতৃবৃন্দ বৈঠক করেন প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে। ওদিকে বিমান কর্তৃপক্ষ গত ৪ নভেম্বর বিমানের পরিচালক (ফাইট অপারেশন) ক্যাপ্টেন শেখ নাসেরকে প্রধান করে পাচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করে। তদন্ত দলে বাপার কোনো প্রতিনিধি না রাখায় শুরু থেকেই একতরফা তদন্তের অভিযোগ করে আসছে পাইলটরা। বাপা সূত্র জানায়, তদন্ত দলে পরিকল্পিতভাবে বাপার কোনো প্রতিনিধি রাখা হয়নি। কিন্তু বাপার সঙ্গে চুক্তির ১৩ নম্বর কজে রয়েছে, যদি কোনো পাইলট সম্পর্কিত তদন্ত হয় তাহলে অবশ্যই বাপার প্রতিনিধি থাকতে হবে। তবে বিমানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জাকিউল আলম বলেন, যেহেতু তদন্ত হবে পাইলটদের বিরুদ্ধে সুতরাং এই তদন্ত দলে পাইলটদের রাখতে হবে এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই।
বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী জিএম কাদের গত ৮ ডিসেম্বর জাতীয় সংসদের প্রশ্নোত্তরে জানান, বিমানের পাইলটদের সাম্প্রতিক ধর্মঘটে তির পরিমাণ আনুমানিক ৭ কোটি ২৯ লাখ টাকা। বিষয়টি তদন্তাধীন রয়েছে। তবে মন্ত্রীর এ বক্তব্যকে প্রত্যাখ্যান করেছে বাপা। তাদের মতে, পাইলটদের দাবি মেনে নিলে এক টাকাও তি হতো না। সরকারের একগুঁয়েমির কারণেই সাড়ে ৭ কোটি টাকা গচ্চা দিতে হয়েছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন পাইলট বলেন, আন্দোলন হয়েছিল বাপার সঙ্গে বিমান প্রশাসনের চুক্তি লঙ্ঘন করে একতরফা সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে। বেতন-ভাতা বাড়ানোর সঙ্গে আন্দোলনের কোনো সম্পর্ক ছিল না। পাইলটদের ন্যায্য দাবির প্রতি বিমান কর্তৃপক্ষের অবজ্ঞার জন্যই এ আর্থিক ক্ষতি ও বিমানের সুনাম ুণœ হওয়ার মতো ঘটনা ঘটেছে।
বিমান সূত্র জানায়, তাদের তদন্ত শেষ হয়েছে। খুব শিগগিরই রিপোর্ট দাখিল করার কথা রয়েছে।
এদিকে বিমান একতরফা তদন্ত ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলে পাইলটরা আবারো রাজপথে নামতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। বাপার সূত্র জানায়, পাইলটদের মাঝে অসন্তোষ বাড়ছে।
অপর এক সূত্র জানায়, পাইলটরা যে পাঁচটি দাবিতে আন্দোলন করছে তার মধ্যে প্রধান দাবি হচ্ছে ওয়েট লিজ পদ্ধতিতে বোয়িং লিজ না নেয়া। কারণ এতে বোয়িংয়ের সঙ্গে ক্রু আসবে। এ ক্রু আসার বিষয়টিই মেনে নিতে পারছে না পাইলটরা। বিমানের এক শীর্ষস্থনীয় কর্মকর্তা বলেন, বর্তমানে যেসব পাইলট আছেন তারা অধিকাংশই আন্তর্জাতিক রুটে শুধু ডিসি-১০ এবং এয়ারবাস চালাতে সক্ষম। বোয়িং লিজ নিলে বিদেশ থেকে ক্রু না নিয়ে এলে বিমানের পাইলটদের প্রশিক্ষণ দিতে খরচ পড়বে প্রতিজনে ৭০ থেকে ৮০ লাখ টাকা। এটিই বাপার সঙ্গে বিমান কর্তৃপক্ষের দ্বন্দ্বের প্রধান কারণ বলে জানা গেছে।


দুর্নীতির একাল-সেকাল
স্বাধীনতাপরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ বিমানে লুটপাট শুরু হয় এরশাদ সরকারের সময়। জাতীয় পার্টির শাসনামলে বিমানমন্ত্রী লে. (অব.) এইচএমএ গাফফার ও প্রতিমন্ত্রী এমএ ছাত্তার দুর্নীতির দুষ্টচক্রে জড়িয়ে পড়েন। শুরু হয় লুটপাট। এ ধারা বিএনপি ও আওয়ামী লীগের সময় অব্যাহত থাকে। বিগত জোট সরকারের সময় বিমানে দুর্নীতি রেকর্ড ছাড়িয়ে যায়। অভিযোগ আছে, সে সময় প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর থেকে অলিখিত নির্দেশ ছিল বিমান ক্রয়-বিক্রয়ের দায়িত্ব পালন করবেন শামীম এস্কান্দার। বিমান সূত্র জানায়, জোট সরকারের পাঁচ বছরে যাবতীয় কমিশনমুখী কার্যক্রম, নিয়োগ-বদলি তিনি নিয়ন্ত্রণ করতেন। এ জন্য তিনি গড়ে তোলেন সিন্ডিকেট। এ সিন্ডিকেটের মাধ্যমে তিনি নিয়ন্ত্রণ করতেন বিমান সংশ্লিষ্ট সব ব্যবসা।
বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর মাত্র তিন মাসের মধ্যে শামীম এস্কান্দার বিমানের ব্যবস্থাপনা, কেনাকাটা, ফাইট অপারেশন ম্যানেজমেন্টসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে নিজস্ব লোক বসান। একইভাবে সিভিল এভিয়েশনও তার নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেন। তৎকালীন চিফ অব শিডিউল মাহমুদ হাসান ছিলেন তার নিজস্ব লোক। ২০০২ সালে লন্ডনে মাহমুদ হাসান হোটেলে দেলোয়ারা নামক কেবিন ক্রুর কক্ষে রহস্যজনকভাবে মারা যান। বিষয়টি নিয়ে তোলপাড় হলে শামীম এস্কান্দার নিজ উদ্যোগে তা ধামাচাপা দেন। একইভাবে ২০০৩ সালের জুলাই মাসে ডিসি-১০ চট্টগ্রামে ২শ ২৫ জন যাত্রী নিয়ে দুর্ঘটনায় পড়ে। ওই বিমানের পাইলটও ছিল তার নিজস্ব লোক। তদন্তে প্রমাণ হয় পাইলট মদ খেয়ে বিমান চালাচ্ছিলেন। কিন্তু শামীম এস্কান্দারের হস্তক্ষেপে এই পাইলটের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নিতে পারেনি কর্তৃপক্ষ। ওই সময় বিমানের লাভ-লোকসানের কথা বিবেচনা না করে এফ-২৮ বিমান ক্রয় করা হয়। ৩৩ বছরের পুরনো এই বিমান দুটি কেনা হয় ২.৯ মিলিয়ন ডলারে। কেনার পরই বিমানের ত্রুটি ধরা পড়ে। বর্তমানে এ দুটি বিমানের রক্ষণাবেক্ষণে বছরে খরচ হয় ৭০ কোটি টাকা। জোটের শাসনামলে ৬৯টি এয়ারবাস লিজে আনা হয়। পাইলট প্রশিক্ষণের নামে শামীম এস্কান্দার তার নিজস্ব প্রতিষ্ঠানের ব্যানারে ৬ কোটি টাকা হাতিয়ে নেন। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের প্যাগাসাস কোম্পানির কাছ থেকে ডিসি-১০ নামে দুটি বিমান আনা হয় ভাড়ায়। প্রতিবছর ভাড়া গুনতে হয় ৬০ কোটি টাকা। অথচ বিমান দুটি কোনো কাজে আসেনি। শুধু কমিশন নেয়ার জন্য এটা করা হয়। এ ছাড়া তিনি ১০টি এয়ার ক্রাফট ক্রয়ের দুর্নীতির সঙ্গেও জড়িয়ে পড়েন।


বিমানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে অভিযোগ
গত ১২ আগস্ট বিমানমন্ত্রী জিএম কাদেরের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ আনে বেসরকারি বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটি। এর আগ থেকেই বিমান লিজসহ বিভিন্ন ইস্যুতে সংসদীয় কমিটির সঙ্গে মন্ত্রণালয়ের বিরোধ চলছিল। সংসদীয় কমিটির সভাপতি ইঞ্জিনিয়ার খোন্দকার মোশাররফ হোসেন কমিটির ১১তম বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের বলেন, এই সভার জন্য আমরা ১৫-২০ দিন আগে নোটিশ দিয়েছিলাম। কিন্তু মন্ত্রী, মন্ত্রণালয়ের সচিব, বিমানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক কেউই সভায় যোগ দেননি। মন্ত্রণালয় থেকে একটি চিঠি দিয়ে জানানো হয়েছে তারা আসতে পারবেন না। বিষয়টি সংসদীয় রীতির পরিপন্থী। এর মাধ্যমে মন্ত্রী সংসদীয় কমিটিকে হেয় করেছেন। কাজটি যে ঠিক হয়নি, কমিটি তা মন্ত্রণালয়কে জানানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। একই সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীকেও জানানোর সিদ্ধান্ত হয়। সংবাদ ব্রিফিংয়ে কমিটির সদস্য মইন উদ্দীন খান বাদল বলেন, মন্ত্রী আমাদের কমিটির ব্যাপারে একতরফা কিছু অভিযোগ করেছেন। আমাদের বিরুদ্ধে একের পর এক মিথ্যাচার করে চলেছেন। ভদ্রতার খাতিরে উত্তর দেইনি। কিন্তু আজ আমাদের কিছু সত্য উচ্চারণে বাধ্য করা হয়েছে। তিনি বলেন, হজ ফাইটের জন্য লিজ নেয়া কাবো এয়ারলাইন্সের বিমান পুরনো দেখিয়ে ফেরত পাঠিয়ে তার স্থলে প্রায় দ্বিগুণ খরচে নতুন কোম্পানির কাছ থেকে হজ ফাইট লিজ নিয়েছেন। বিমানমন্ত্রী কাবো এয়ারের কাছ থেকে ভাড়া করা উড়োজাহাজ উড়তে দেননি। এ জন্য জেদ্দা ও রিয়াদে মারামারি হয়েছে। ওই উড়োজাহাজের ৫৪৫ জন যাত্রীকে হোটেলে রাখতে গিয়ে ২২ লাখ টাকা খরচ হয়েছে। এর দায় কে বহন করবে? মইন উদ্দীন খান বাদল আরো বলেন, হজযাত্রী আনা-নেয়ার জন্য পাঁচটি প্রতিষ্ঠান দরপত্র জমা দিয়েছিল। থাইল্যান্ডভিত্তিক একটি প্রতিষ্ঠান প্রতি উড্ডয়ন ঘণ্টার জন্য ৯ হাজার ৮শ ডলার দর প্রস্তাব করেছিল। অস্ট্রেলিয়াভিত্তিক অসবেন (অসবেন অ্যারোনটিক্যাল সার্ভিসেস) দর প্রস্তাব দিয়েছিল ১০ হাজার ৬শ ডলার করে। মন্ত্রণালয় অসবেনকে কাজ দেওয়ার জন্য দরপত্রে কাটাকাটি করে দর ৯ হাজার ৬শ ডলার করেছে। অস্ট্রেলিয়ার অসবেন নামক যে কোম্পানির কাছ থেকে এবারের হজ ফাইট লিজ নেয়া হয়েছে, তাদের সঙ্গে বিগত চারদলীয় জোট সরকারের আমলে হাওয়া ভবনের যোগসাজশ ছিল বলেও অভিযোগ করেন মইন উদ্দীন খান বাদল। তিনি জানান, এই কোম্পানির কাছ থেকে ফাইট লিজ নেয়ায় শুধু হজযাত্রী পরিবহন বাবদই বিমানকে ২ লাখ ৫৫ হাজার ডলার লোকসান গুনতে হয়। এ ধরনের দুর্নীতির পেছনে মন্ত্রী, তার আত্মীয়স্বজন, তার মেয়ে বা মেয়ের জামাইয়ের ব্যবসায়িক সম্পর্কের অভিযোগ তুলে তা খতিয়ে দেখারও আহ্বান জানান তিনি। সংসদীয় কমিটির বিরুদ্ধে পাল্টা অভিযোগ তুলে জিএম কাদের বলেছিলেন, নিয়মানুযায়ী মন্ত্রীর সঙ্গে আলাপ না করে সংসদীয় কমিটির বৈঠকে সিদ্ধান্ত নেয়া উচিত নয়। শুধু আমার দুর্নাম ছড়ানোর জন্যই কমিটির ওই বৈঠক ডাকা হয়েছিল।


যে বিষয় পদত্যাগ
গত ৮ জুলাই মন্ত্রিসভা থেকে বিমানমন্ত্রী পদত্যাগ করেছেন বলে খবর ছড়িয়ে পড়ে। সে সময় জাতীয় পার্টির একাধিক সূত্র দাবি করে তিনি তার পদত্যাগপত্র সরকারের নীতিনির্ধারক মহলে পৌঁছে দিয়েছেন। এ সময় মোবাইল ফোন বন্ধ রাখেন বিমানমন্ত্রী জিএম কাদের। টেলিফোন করে তার খোঁজ পাওয়া যায়নি। জানা গেছে, হোটেল ওয়েস্টিনের বর্ধিত অংশ ভাঙার বিরোধিতা, হোটেল শেরাটন লিজ দেওয়া ও পরিবারের সদস্যদের দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়া এই তিন সঙ্কটে তার ইমেজ নষ্ট হয়ে যায়। ইমেজ রক্ষায় তিনি এই পদত্যাগ নাটক মঞ্চস্থ করেন বলে মন্তব্য করেছেন অনেকে।


অবশেষে এরশাদ
জিএম কাদেরকে ঘিরে সরকারে গুজবের নানা জল্পনা জন্ম নিলে মহাজোটে টানাপড়েন শুরু হয়। মন্ত্রিত্ব ধরে রাখতে সক্রিয় হন এরশাদ। তিনি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে বৈঠক করেন। এরপর জিএম কাদের নিয়মিত অফিস করা শুরু করেন।


বিব্রত প্রধানমন্ত্রী
বিমানের ত্রিমুখী দ্বন্দ্ব ও সঙ্কট নিয়ে বিব্রত ও অসন্তুষ্ট প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। জানা গেছে, প্রধানমন্ত্রী তার কার্যালয় থেকে গত প্রায় দুই বছরে বেসরকারি বিমান ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের কাজ খতিয়ে দেখা ও তিন পক্ষের বিরোধের কারণ বের করার নির্দেশ দেন। এ সংক্রান্ত বিষয়ে বিভিন্ন সংস্থা প্রতিবেদন দাখিল করে। প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে প্রধানমন্ত্রী তিন পক্ষের সঙ্গে কথা বলেন। এর আগে তিনি একজন উপদেষ্টা ও একজন মন্ত্রীকেও সমস্যা খুঁজে বের করার নির্দেশ দেন। প্রধানমন্ত্রী বিমানমন্ত্রীর দায়ের করা অভিযোগ, বিমান চেয়ারম্যান ও সংসদীয় কমিটির দায়ের করা অভিযোগ পর্যালোচনা করে তিন পক্ষের মধ্যে আপস করে দেন। এভাবে বিমানে সঙ্কটের প্রাথমিক সমাধান হয়। প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপে প্রাথমিক সমাধান হলেও ভেতরের ক্ষোভ প্রশমিত হয়নি বলেই জানা গেছে।


মন্ত্রী যা বললেন
বিমানের সঙ্কট নিয়ে প্রশ্ন করা হলে বেসরকারি বিমান ও পর্যটনমন্ত্রী জিএম কাদের ২০০০কে বলেন, কিছু সমস্যা হয়েছিল এ কথা সত্য কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর দিকনির্দেশনায় তা সমাধান হয়ে গেছে। তার বিরুদ্ধে সংসদীয় কমিটির দুর্নীতির অভিযোগ প্রসঙ্গে বলেন, এটা একটা ভুল বোঝাবুঝি থেকে হয়েছিল। যে সমস্যাটি হয়েছিল তার ইতিবাচক সমাধান হয়ে গেছে। আর হোটেল ওয়েস্টিন ও শেরাটন নিয়ে পত্র-পত্রিকায় যে রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছে তা সত্য নয়। এখানে কোনো সিন্ডিকেট নেই।
বিমান চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল (অব.) জামালউদ্দিন আহমদ বলেন, বিমানে যে সঙ্কট হয়েছিল তার সমাধান হয়ে গেছে। এখন আরো স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বেড়েছে। ইমেজ সঙ্কট কাটিয়ে বিমান অচিরেই লাভজনক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হবে।
(সাপ্তাহিক ২০০০
৩১-১২-২০১০ তারিখের সংখ্যায় প্রকাশিত)


আসাদ জোবায়ের
স্টাফ রিপোর্টার
সাপ্তহিক-২০০০

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন